স্বাধীনতার ৫০ বছরের অঙ্গীকার হোক সাংবাদিক নির্যাতনমুক্ত বাংলাদেশের
ইপেপার / প্রিন্ট
হাফিজুর রহমান::
বাংলাদেশ,এটি শুধু একটি দেশের নাম নয়। কোটি মানুষের আবেগের নামও। দীর্ঘদিন পরাধীনতার শিকল থাকার পর যখন বৃটিশ সরকারের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে এ জনপদের মানুষ তখনও স্বাধীনতার স্বাদ পাইনি আমরা। দীর্ঘ ২৪ বছরের শোষণ শেষে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে ৩০ লক্ষ শহীদ ও ২ লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে পেয়েছি শত বছরের কামনার স্বাধীনতার স্বাদ। এ উপলক্ষ্যে সারাদেশের মানুষ পালন করবে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তি।
আমাদের গৌরবোজ্জ্বল মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বিশ্বে জনমত গঠনসহ স্বশরীরে সম্মূখসারির যোদ্ধা হিসেবেও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে দেশ স্বাধীন করেছে আমাদের উত্তরসূরি মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিকবৃন্দ। কিন্তু আজও পূর্ণ স্বাধীনতার স্বাদ পায়নি এদেশের সাংবাদিকরা। গণমাধ্যম মালিক থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে নির্যাতিত হচ্ছেন এদেশের সাংবাদিকরা। অথচ দেশের যেকোনো দূর্যোগে,দুঃসময়ে এই সাংবাদিকরাই এগিয়ে যায় সবার আগে, পেতে দেয় নিজেদের বুক। কিন্তু দিনশেষে এই সাংবাদিকরাই নির্যাতিত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। সারাদিন সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করা এই সাংবাদিকরাই অধিকার বঞ্চিত,পায়না নিজেদের কাঙ্খিত বিচারটুকুও। অনেক সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও পাশ কাটিয়ে যায়।
স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ক’জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তার কি হিসাব আছে? বিভিন্ন মেয়াদের বিচ্ছিন্ন কিছু হিসাব হয়তো আমাদের হাতে আছে। ২০০১ সাল থেকে ২০১৬- এই ক’বছরে দেশে ২৩ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। বিএনপির ২০০১-২০০৬ সালের মধ্যেই নিহত হন ১৪ জন সাংবাদিক, আর আহত হন ৫৬১ জন। আর ২০০৭ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে নয় বছরে খুন হন নয় জন সাংবাদিক। আরেক পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ২২ বছরে বাংলাদেশে ৩৫ জন সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। মনে রাখতে হবে, নির্যাতন বা হত্যাকাণ্ডের এই খতিয়ান কখনোই পূর্ণাঙ্গ নয়। অনেক ঘটনাই রয়ে যায় চোখের আড়ালে।
মফস্বলের সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা তো অহরহ। নেই তেমন কোনো বিচারের উদ্দ্যোগ। স্থানীয় পর্যায়ের কিছু দূর্নীতিবাজ জনপ্রতিনিধি ও বেপরোয়া নীতিহীন নেতা নামধারীরা সাংবাদিক নির্যাতনে এগিয়ে। মূলত বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই বাড়ছে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা। সাংবাদিকদের নিজেদের আন্ত দ্বন্দ্বও সাংবাদিক নির্যাতনের অনেকটা দায়ি। তাছাড়া সত্য প্রকাশ করতে গেলেও দেয়া হয় চাঁদাবাজির মতো ঘৃণ্য অপরাধের দায় এর সাথে যুক্ত হয়েছে মরার উপর খারার ঘাঁ এর মতো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। যদিও সরকারের উপর মহলের পক্ষ থেকে বার বার বলা হচ্ছে এই আইনের ফলে সাংবাদিকরা কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না,কিন্তু বাস্তব সম্পূর্ণ উল্টো।
সিজিএস ২০২১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬৬৮ টি মামলার বিবরণ চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে। এই মামলাগুলোয় অভিযুক্তের সংখ্যা ১ হাজার ৫১৬ জন, যার মধ্যে ১৪২ জন সাংবাদিক, ৩৫ জন শিক্ষক, ১৯৪ জন রাজনীতিবিদ, ৬৭ জন শিক্ষার্থী।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সাংবাদিক ২৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ। মামলাগুলোতে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের মধ্যে সাংবাদিকদের সংখ্যা অসমভাবে বেশি। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। বহু মানুষের প্রতিবাদের পরও তবুও চলছে আইনটি। এই তো গেলো বাইরের কথা, সাংবাদিকরা নিজ ঘরে মানে তার কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত। নবম ওয়েজবোর্ডের দাবি তোলা হলে মফস্বলের ৯০ শতাংশ সাংবাদিকরাই অষ্টম ওয়েজ বোর্ড কি সেটাও জানেন না। অফিসিয়াল যারা কাজ করেন তাদের বিট আলাদা হলেও মফস্বলের সাংবাদিকরা জুতো সেলাই থেকে চণ্ডী পাঠ সবই একা নিজেদেরই করতে হয়। তারপরও বেতনের বেলায় যে কি অবস্থা সেটা হয়তো যারা কাজ করেন তারাই ভালো বলতে পারবেন। যেখানে একজন গার্মেন্টস শ্রমিকের সর্বনিন্ম মজুরি ৮,৫০০ টাকা সেখানে এক কথায় বিনামূল্যেই পাওয়া যাচ্ছে স্নাতক/স্নাতকোত্তর পাস করা কিংবা পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের। তবে এটিও অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে এদেশে সাংবাদিকতা করতে বা সাংবাদিক হতে হলে শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো মাপকাঠি নেই। যেকেউ এই পেশায় প্রবেশ করতে পারে এর সুযোগ নিয়ে সমাজের কিছু উশৃঙ্খল লোক এই পেশায় এসে পেশাটিকে কলুষিত করছে। এর ফলে এই পেশার প্রতি সাধারণ মানুষের ধারণা অনেকটাই নেতিবাচক হচ্ছে। অবশ্য এর পেছনে প্রেস কাউন্সিলের দায় কোনো অংশে কম নয়। সাংবাদিকতা প্রবেশের জন্য শিক্ষাগত ও নৈতিকতার একটি মাপকাঠি করা উচিৎ। তাছাড়া সাংবাদিকদের রাজনীতিতে জড়ানোর সংস্কৃতিটা সাম্প্রতিক সময়ে খুব দেখা যাচ্ছে। নিজেরা সাংবাদিক পরিচয়ের চেয়ে দাপুটে রাজনৈতিক নেতা কর্মী পরিচয় দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। ব্যক্তির রাজনৈতিক অধিকার রয়েছে তবে সাংবাদিকতা পেশায় প্রবেশের পর তা প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন উচিৎ নয়।
অথচ এই মফস্বল সাংবাদিকরাই গণমাধ্যমের প্রাণ হিসেবে বিবেচিত। অফিস ও মফস্বল বেতন বৈষম্য থাকলেও কারোর মুখেই শব্দ নেই। যারাই শব্দ করবেন তাদেরই চাকরি নেই। যদিও ঢাকার সাংবাদিকদেরও অভিযোগের অন্ত নেই কারো বা আবার ১০ মাস বা বছরেরও বেশি সময় ধরে বেতন বন্ধ। তবে এতো কিছুর পরও কিন্তু গণমাধ্যম একদিনের জন্যও বন্ধ থাকেনি। কারণ গণমাধ্যমকর্মীরা নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে সবার আগে।
যদিও বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সাংবাদিক বান্ধব বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে অনেক সাংবাদিকদের আর্থিক সহযোগীতা করেছেন।
স্বাধীনতার ৫০ বছরে সুবর্ণ জয়ন্তী পালিত হচ্ছে সারা দেশে। আমরা সাংবাদিক,আমাদের পূর্বপুরুষ (মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিকদের আমরা আমাদের আদর্শিক পূর্বপুরুষ মনে করি) তাঁদের ত্যাগের বিনিময়ে চাই নির্যাতন,হামলা,মামলা মুক্ত স্বাধীনচেতা সাংবাদিকতা।
সাংবাদিকতা স্বাধীনতা থাকলে রাষ্ট্রের সকল সেক্টর জবাবদিহিতার অধীনে চলে আসবে। সাংবাদিক নির্যাতন কমলে নতুন যারা আসতে চাচ্ছেন তারাও এগিয়ে আসবেন অন্যথায় নতুনরা সাংবাদিকতার দিক থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন।পাশাপাশি এযাবৎ কালে সাংবাদিকদের উপর হামলা,মিথ্যা মামলাসহ সকল নির্যাতনের বিচারের জন্য একটি নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় ট্রাইব্যুনাল করতে হবে।
লেখক: হাফিজুর রহমান, নির্বাহী সম্পাদক
সাপ্তাহিক জনতার নিঃশ্বাস।
Related News
ত্রিশাল মুক্ত দিবস উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে বিজয় র্যালি
হানিফ আকন্দ,ত্রিশাল প্রতিনিধি:: ৯ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ত্রিশাল মুক্ত দিবস। দেশমাতৃকাকে রক্ষা করতে মুক্তিকামী দামাল ছেলেরাRead More
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এনপিএসের সিনিয়র যুগ্ন মহাসচিব নির্বাচিত হয়েছেন সাংবাদিক ছাবির উদ্দিন রাজু ভৈরব কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
ভৈরব, কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি:: আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ন্যাশনাল প্রেসসোসাইটি এনপিএস গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থা- এর কেন্দ্রীয়Read More

